থ্রিএফফোরডি সেচ পদ্ধতি

যশোরে আর্সেনিকপ্রবণ এলাকায় নিরাপদ ধান উৎপাদন

যশোর শহর থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরের গ্রাম মাড়ুয়া। চৌগাছা উপজেলার কৃষিসমৃদ্ধ এ গ্রামে গত দুই দশকে আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়ে প্রাণহানি ঘটেছে ৩০ জনের।

যশোর শহর থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরের গ্রাম মাড়ুয়া। চৌগাছা উপজেলার কৃষিসমৃদ্ধ এ গ্রামে গত দুই দশকে আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়ে প্রাণহানি ঘটেছে ৩০ জনের। অঙ্গহানি হয়েছে অনেকের। এ রোগে এখনো আক্রান্ত গ্রামটির বহু মানুষ। এ পরিস্থিতিতে খাওয়ার পানির মাধ্যমে আর্সেনিক সংক্রমণ ঠেকাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হলেও সেচের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে ধানসহ অন্যান্য ফসলেও।

তবে জাপানের ন্যাশনাল এগ্রিকালচার এ-ফুড রিসার্স ইনস্টিটিউটের (নারো) উদ্ভাবিত থ্রিএফফোরডি (তিনদিন ভেজানো ও চারদিন শুকনো) সেচ পদ্ধতি নতুন করে আশা জাগিয়েছে এ অঞ্চলের মানুষের। ন্যাচারাল প্রযুক্তির এ পদ্ধতি ব্যবহারে ধানে আর্সেনিকের মাত্রা ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর পাশাপাশি কমিয়েছে সেচের পরিমাণ ও উৎপাদন খরচ। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া ঠেকাতেও ভূমিকা রাখবে এ পদ্ধতি।

এবার প্রথমবারের মতো থ্রিএফফোরডি সেচ পদ্ধতি ব্যবহার করে ধান চাষ করেছেন মাড়ুয়া গ্রামের তৌহিদুল ইসলাম নয়ন। তিনি জানান, পাশাপাশি দুটি জমির একটিতে থ্রিএফফোরডি পদ্ধতিতে আর অন্যটিতে সাধারণ পদ্ধতিতে বোরো আবাদ করেছেন। তবে থ্রিএফফোরডি পদ্ধতি প্রয়োগ করে পেয়েছেন বেশি ফলন। উৎপাদন ব্যয়ও কমেছে তার।

এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্কের মাঠ সমন্বয়ক আবু হাসান বলেন, ‘মাড়ুয়া গ্রাম আর্সেনিকপ্রবণ এলাকা। এ এলাকায় আর্সেনিক সহনশীল খাদ্য উৎপাদনই আমাদের মূল লক্ষ্য। এতদিন খাবার পানিতে আর্সেনিক থাকলেও এখন ফসলেও সেটি বহন করছে। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) কারিগরি সহায়তায় ‘নিরাপদ ও পুষ্টিকর ধান উৎপাদনের জন্য প্রজনন ও পানি ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তির উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় গবেষণা কার্যক্রমটি পরিচালিত হয়। কৃষক এ পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে অনেকটা সফল। সেচের পানি ব্যবহারও ৭০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয়ী ও ৪০ শতাংশ পর্যন্ত আর্সেনিক কম আসছে চাষাবাদে।’

সম্প্রতি প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে আসেন জাইকা, ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ প্রকল্পটির বাংলাদেশ প্রতিনিধিরাও। প্রতিনিধি দলের সদস্য বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘উদ্ভাবিত সেচ পদ্ধতির মাধ্যমে চালে অজৈব আর্সেনিকের মাত্রা ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাবে। পাশাপাশি এ পদ্ধতির মাধ্যমে সেচের পানি ৬৫-৮০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় হবে, ফলে কমবে উৎপাদন খরচ।’

গবেষক ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের অনেক এলাকার ভূগর্ভস্থ পানি আর্সেনিক দ্বারা দূষিত। অবিরাম জলাবদ্ধতার সময় ধান চাষ করলে চালের মধ্যে এ বিষাক্ত উপাদানের মাত্রা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু থ্রিএফফোরডি পদ্ধতি ব্যবহার করে নিরাপদ চাল উৎপাদন করা যাবে। শুধু আর্সেনিকের ঝুঁকি কমাতেই নয়, বরং সেচের পানির চাহিদাও ব্যাপকভাবে হ্রাস করে, ফলে ভূগর্ভস্থ পানি দূষণপ্রবণ অঞ্চলে জনস্বাস্থ্য রক্ষা ও টেকসই ধান উৎপাদনের এক বাস্তবভিত্তিক সমাধান হিসেবে এটি বিবেচিত হতে পারে।’

জাপানের ন্যাশনাল এগ্রিকালচার এ-ফুড রিসার্স ইনস্টিটিউটের গবেষক কেন নাকামুরা বলেন, ‘ধানের শীষ বের হওয়ার তিন সপ্তাহ আগে ও চার সপ্তাহ পরে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে জমিতে সেচ দিতে হয়। আর্সেনিক ভারি হওয়ায় পানির তলানিতে জমা হয়। এ পদ্ধতিতে মাটিতে যে আর্সেনিক রয়েছে তা পানির মাধ্যমে উপরে উঠতে পারে না।’

জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর টাকিহিরো ক্যামিয়া সেনসি বলেন, ‘এ পদ্ধতিতে উৎপাদিত ধানে আর্সেনিকের মাত্রা পাওয়া গেছে মাত্র দশমিক ২ শতাংশ, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি সীমার নিচে।’

এ ব্যাপারে চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুশাব্বির হোসাইন বলেন, ‘উদ্ভাবিত এ সেচ পদ্ধতির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা গেলে আর্সেনিকপ্রবণ এলাকায় নিরাপদ খাদ্যশস্য উৎপাদন নিশ্চিত হবে। এরই মধ্যে উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।’

আরও